২৩ শে মার্চ রাতে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায় একজন ছোট্ট মেয়ে শিশু তার মৃত মায়ের কবরে কাছে গিয়ে চিৎকার করে কান্না করছে এবং বলছে "কিল লাইগা একা করে করে গেছেন, অ্যাঁরে লইয়া যাইতে পারেন ন, ও আম্মু বের হন না"।
ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লার লালমাইয়ে, প্রথমে এর সূত্রপাত হয় একজন ছোট্ট মেয়ে শিশু প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর আগে তার মা মারা যায়, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে জীবনের তাগিদে সৌদি আরবে চলে যান। মা'হারা মেয়েটি তখন তার সৎ মায়ের দায়িত্বে থাকে। সৎমা আয়েশা আক্তার শিশুটিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এমনকি ঘরে আটকে রাখতেন বলে অভিযোগ আছে।
সাম্প্রতিক ২৩ শে মার্চ এর আগে একদিন শিশুটির উপর তার সৎ মা নির্যাতন করে। শিশুটি তার সৎ মায়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ছুটে চলে যায় তার মৃত মায়ের কবরের পাশে এবং সেখানে খুব উচ্চস্বরে কান্না করতে থাকে এবং বলছে "কিল লাইগা একা করে করে গেছেন, অ্যাঁরে লইয়া যাইতে পারেন ন, ও আম্মু বের হন না"।
এই কান্নার ভিডিওটি পাশ থেকে একজন ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করে ২৩ শে মার্চ রাতেই খুব দ্রুত ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা যায় লালমাই উপজেলার নির্বাহ কর্মকর্তা উম্মে তাহমিনা মিতু এর তদন্তের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত সৎ মা আয়েশা আক্তার নির্বাহী কর্মকর্তা উমে তামিনা মিতুর কাছে সবকিছু স্বীকার করে তার ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং মুচলেকা দিয়ে তিনি বাসায় আসেন।
হয়তো বলতে পারেন ছবির এক কর্নারে গলি বয় রানার ছবি কেন?
আমি দিলাম আমার মূল কথা আসলে লালমাই উপজেলার হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে না।
কারণ এ ঘটনা সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে ভাইরাল, একটি বিষয় যা সবার জানা এবং দেখা। সুতরাং আমার নতুন করে বলার কিছু নেই।
ছবির এক কর্নারে গলি বয় রানার ছবি দেওয়ার কারণ হচ্ছে আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া।
আপনাদের অবশ্যই মনে থাকবে,
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে বেড়ে ওঠা এক পথ শিশু রানা মৃধা, যে পথে পথে ঘুরে ফুল বিক্রি করতো। কোন একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান তাবীব রানাকে আবিষ্কার করেন। এই রানা তার গুণের কারণে রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়াতে জায়গা করে নেয়।
লালমাইয়ের ঘটনার মতোই গলি বয় রানাও কিন্তু একটা সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ফলশ্রুতিতে তার জীবনের গতি ঘুরিয়ে যায়।
রানাকেও নিয়ে বলার আমার কিছু নেই। রানার বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুই জানে।
এখন আসি মূল কথায়ঃ
লাল মাইয়া যে ছোট্ট শিশুটি তার মায়ের কবরের পাশে বুক ভাঙ্গা
আর্তনাদে গগন বিদীর্ণ করে কান্না করছিল, সেই ভিডিওটা যদি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল না হতো বা কেউ যদি ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড না করতো, আজ অবধি সেই ছোট্ট শিশু মেয়েটি তার সৎ মায়ের নির্যাতনের শিকার হতে থাকতো।
আমরা মানুষ আজব একটা প্রাণী, যেটা আমাদের চোখের সামনে ব্যাপকভাবে পরিচিত লাভ করে, আমরা অনেকেই আছি কিছু ভিউ অথবা কিছু সুনাম কামানোর জন্য তাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই।
তারপরও আমি সেইসব মানুষদের স্বাগতম জানাই এবং মন থেকে দোয়া করি তাদের জন্য হলেও কিছু শিশু নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে যায়। কিছু মানুষ সহযোগিতার দরজা খোলা পায়। কিছু অসঙ্গত বিষয় খুব সহজে সমাধান হয়।
আপনি কি বলতে পারবেন লালমাইয়ের সেই ছোট্ট শিশুটি কি বাংলাদেশের একমাত্র শিশু? যে কিনা সৎ মায়ের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশে এরকম হাজার হাজার শিশু রয়েছে যারা আজ অবধি সৎ মায়ের হাতে নির্যাতিত এদের দায়িত্ব কে নেবে। সেই শিশুগুলোর ভাগ্য খুলে দেওয়ার ভার কার হাতে থাকবে? সেই শিশুগুলো মুক্তি পাবে কিভাবে? কখনো কি চিন্তা করে দেখেছেন। যদি লালমাইয়ের এই ছোট্ট শিশুটি ভিডিওটা ভাইরাল না হত কতদিন পর্যন্ত তার উপরে নির্যাতন চলতে থাকতো, একটা সময় সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবনকে নষ্ট করে দিত হয়তো। ভাগ্যটা তার সাথে ছিল বলে হয়তো সে মুক্তির পথে।
তো একবার চিন্তা করে দেখুন, যে বিষয়গুলো আমাদের নজরের বাহিরে। তাদের জীবন কিভাবে অতিবাহিত হচ্ছে। তাদের মুক্তিরদার তারা উন্মোচিত করবে কিভাবে? আদৌ কি কেউ ভেবেছেন_ এই দায়িত্বটা কার? শুধু কয়েকজন সামাজিক কর্মী কোন ভাইরাল শিশুকে নিয়ে কাজ করলেই সমাধান হয়ে যায়? বাস্তবতায় আড়ালে থাকা এরকম হাজারো হাজারো শিশু কান্না আকাশকে বিদীর্ণ করছে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। তাদের দায়িত্বটা কে নেবে? আদৌ কি সম্ভব কোন এনজিও কোন সামাজিককর্মী অথবা কোন রাজনৈতিক দল এমন কি রাষ্ট্র এ দায়িত্ব নিয়ে সমাধান করা।
সকল সংস্থা মিলে এবং রাষ্ট্র যদি দায়িত্ব নেয় তারপরেও এর সমাধান শতভাগ নিশ্চিত করতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি মা'কে অভ্যন্তরীণ থেকে সচেতন করা না যায়। যখন একটি রাষ্ট্র সমস্যার মূলকে নির্দিষ্ট করে সমাধানের পথ খোঁজে তখনই শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
আমার মা জাতিদের প্রতি তেমন কোন কথা নেই, শুধু একটা কথাই বলতে চাই। আপনি আজকে মা কিন্তু কোন একটা সময়ে কারো সন্তান ছিলেন। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো আপনার সেই সৎ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে। যদি আপনার জীবনটি এরকম হতো আপনি যদি তার জায়গায় থাকতেন। আপনি কি করতেন?
আপনার হৃদয়ে কি জায়গায় এত সংকীর্ণ যে আপনার মেয়েকে জায়গা দেওয়ার মত শূন্যস্থান টুকু নেই। যখন আপনার একটা সন্তান থেকে তিনটা সন্তান জন্ম নেবে, ঠিক তিন সন্তানকেই আপনার বুকে জায়গা দিতে পারেন। তবে কেন আরেকটি সন্তান আপনার কাছে বেশি হয়ে যায়। আপনার সাথে তার লেনদেনটা কি? তাকে যদি একটু মায়া-মমতা দেন, আপনার কি সেখানে কমতি পড়ে যাবে? আপনার ভেতরে মায়া মমতার কোন ঘাটতি হয়ে যাবে? এটি তো সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার দান। তবে কেন আপনার এত সংকীর্ণতা।
আপনি কেন চোখ বন্ধ করে ভাবতে পারেন না। আপনি যদি না থাকেন, আপনার সন্তান অবশ্যই কারো না কারো হাতে থাকবে। সেই মা যদি আপনার সন্তানের সাথে এ রকম ব্যবহার করে, একই রকম নির্যাতন করে, আপনি মা আপনার মন এ কথাটা ভাবতে কেমন লাগে।
একটু জানাবেন?
আপনি "মা" আপনাকে নিয়ে আমার তেমন কিছুই বলার নেই। শুধু এটুকুই বলি_ মা হচ্ছে সমস্ত শিশুর মা। মা একটি মহিমা, মা একটি মমতা, মা একটি বিশ্, মা একটি জগত। আপনার ভেতর থেকে সমস্ত সংকীর্ণতা দূর হয়ে, আপনার মমতার সাগরে সকল শিশুর স্থান হোক। এই প্রত্যাশায় পৃথিবীর সকল মা জাতিকে জানাই শুভ কামনা।
0 Comments