আমার শৈশবের মধুর স্মৃতি। যা এখনও মনে হলে চোখ বেয়ে জ্বল চলে আসে।
Note: Ai generated pic তবে বাস্তবে এইরকমি ছিল।
যখন পড়াশোনার ক্যাটাগরি তে ভালো-মন্দ জানার বা বোঝার মত সময় হলো ঠিক তখনই আমি দেখলাম মেয়েটি পড়ালেখাতেও টপ। আমার এট্রাকশন আরও বেড়ে গেল। তার সাথে কথা বলতে ভাল লাগতো। অবসরে তাকে নিয়ে ভাবতেও ভাল লাগতো। আমাদের মাঝে ভাল বন্ধুত্ব ছিল শ্রেনীবন্ধু হিসাবে। আমাদের মাঝে ক্লাসেও পড়াশোনার ব্যাপারে ভাল কম্পিটিশন ছিল। সে পড়াশোনাতে খুব সিরিয়াস ছিল মেয়ে মানুষ সাধারণত যেমন হয়। তারা যাই করুক না কেন, পড়ার সময় মনোযোগী। আমি ততটা ভাল ছাত্র ছিলাম না, কারন পড়াশোনার বিষয়ে আমি ভাল উদাসীন ছিলাম। এভাবেই চলতে থাকে সব কিছু। বছর শেষ রেজাল্ট দিবে সবাই হাজির। যথারীতি আমিও স্কুলে এসেছি। রোল এক বলে ডাক দিয়ে তার নাম বললেন। সে উঠে রেজাল্ট নিতে গেলে আমিও খুশি হয়। সে উৎফুল্ল মেজাজে রেজাল্ট নিয়ে এলো। আমি মনের আনন্দে মুচকি হাসতেছিলাম কারন সে ফাস্ট হয়েছে আমি মহা খুশি। আমিতো তার মত পড়ালেখা করি না, তাই আমার রোল এক হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এরপর স্যার বলল রোল দুই আরাফাত হাসান নয়ন। তখন মনটা হঠাৎই মলিন হয়ে গেল আমার। আমি এতটাও খারাপ ছাত্র ছিলাম না যে আমার রোল দুইয়ে থাকবে না। একটা বিষন্নতা কাজ করতে শুরু করলো। মনে হচ্ছিল আমি হেরে গেলাম, আমিও তো ভাল পড়ছি ভাল লেগেছি তাহলে কি ভাবে দুই রোলে আমার জায়গা হল না। এক না হয় স্বপ্নের রানীকে ছেড়ে দিলাম। কিন্ত দুইওতো হতে পারলাম না। পরে একটু শান্ত হই কারন যে দুই নাম্বারে ছিল সেও আমার সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। রোল তিন বলে আমার নাম ধরে ডাকলেন আমি ততটা খুশি হতে পারিনি কারন তার পাশেই আমার রোলটা নেই।
একে একে সবার রেজাল্ট দেওয়ার পর স্যার চলে গেলে, সে তার নিজের রেজাল্ট শীট নিয়ে খুশি হয়ে হাসতে হাসতে আমাদের কাছে এসে বলল তোদের নাম্বার গুলো দেখি। নয়ন তার রেজাল্ট শীট দিল আমিও দিলাম ও দেখলো তবে নয়নের সাথে বেশি কথা বলছিল কারন নয়ন সেকেন্ড হয়েছে। দুজনে হাসতেছিল আর গল্প করছিল। এদিকে আমি হিংসায় জ্বলছিলাম। কিছু করার নেই। এই অবহেলা নিয়েই চলতে হয় কিছুদিন।
আমার রেজাল্ট এর চেয়ে ভাল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারন এর চেয়েও ভাল করতে হলে আমার রাজ্য দেখাশোনা করবে কে? আমি একজন বিজ্ঞানী আমার ল্যাবে গবেষণা করবে কে?
আমার ল্যাব আমার বাড়ি থেকে বেশি দুরে না। স্কুলের কাছে অর্থাৎ স্কুলের বারান্দা।
বিকাল চারটা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পাঠ দান চললেও, ছুটির পর তা হয়ে যায় আমার ল্যাব। স্কুলের পাকা বারান্দা ছিল পুরনো হয়েছে তাই মাঝে মাঝে বিভিন্ন আকৃতিতে উঠে গিয়ে নষ্ট হয়েছে। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট গর্ত, সেখানে আমার গবেষণা ব্যাহত হত। তাই ক্লাস ওয়ান/থ্রী এর বারান্দার শেষ অংশে ছিল মসৃণ পাকা বারান্দা। আর ঐখানেই চলতো আমার গবেষনা।
স্কুল ছুটির পর সবাই যখন বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতো। তখন আমি স্কুলের সামনে থাকা পুকুর পারের এটেল মাটি হাতের বুরো আঙ্গুল দিয়ে কেটে আমার ল্যাবে নিয়ে আসতাম। মনের মাধুরি মিশিয়ে কখনও তৈরি করতাম ট্রাক বাস গরুর গাড়ি হেলিকপ্টার বিমান ট্রেন নৌকা ঘর এমন কোন আবিষ্কার নেই আমি আমার ল্যাবে করি নাই। এমন কি কোন কোন সময় সব কিছু এনে বাড়ির বাহিরের সামনে ফাঁকা উঠোনে অর্থাৎ নিজেদের পুকুর পারে আসতো একটা শহর গড়ে তুলতাম। আমি অনেক বড় হয়েও মাটি দিয়ে খেলেছি। মাটি যেন আমার অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। আমার স্বপ্ন গুলো মাটির গড়া নিজের কারুকাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। মাটির গন্ধ আমাকে পাগল করে দিত। এখনও মাঝে মাঝে কোথাও এটেল মাটি দেখলে পাগলামি ধরে। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রান ভরে মাটির গন্ধ নিই। অনেকের কাছে পাগলপন মনে হলেও এটি আমার শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভুলার কোন অপশন নেই।
মাঝে মাঝে ঘোড়া (খড়ের গাদা উল্টানো হয় যেটা দিয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কারল বলা হয়) নিয়ে আমার রাজ্যের ভিতরে ঘুরে বেড়াতাম। আমার বাগান গুলো দেখাশোনা করতাম। আমার বাগানে যখন বিভিন্ন ধরনের প্রানী দেখতাম তখন খুব আপন করে ভাবতাম তাদের। তবে আমার রাজ্যের মেয়াদ সাধারনত থাকতো বসন্ত দুই থেকে তিন মাস। এক কথায় যখন প্রকৃতি নিজ গুনে সাঁজতো। চারপাশ ফুলে ফুলে ভরে যেত। আমাদের গ্রামের রাস্তার পাশে অনেক গুল্ম ঝোপঝাড় ছিল। সেগুলোতেও অনেক অপরিচিত ফুলফল ধরতো। সেই সময়টা আমার মনে এই রাজ্যের খেলাটা জেগে উঠতো। এছাড়া বাকি সময় আমার গবেষনা কাটতো ল্যাবে অথবা হাতুর বাটাল দা এইটা ঐটা কাটা জোড়া কতকিছু। এভাবেই চলতে থাকে আমার দিন।
পড়াশোনা নিয়ে ততটা মাথা ঘামাই না। গ্রাম মবস্বলে যে ভাবে রাতে দুই ঠ্যালা সকালে দুই ঠ্যালা দিয়ে পড়া হত, আমিও তাই করি।
( বিশেষ দ্রষ্টব্য এখন কিন্তু শহরের তুলনায় গ্রামের ছেলে মেয়ে পড়াশোনায় বেশি সচেতন দেখা যায়)
তারপর একদিন বাবা বলল বড় জন যেহেতু আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ে, ওকেও (আমাকে) ভর্তি করে দিব ওখানে। দুই ভাই একসাথে সাইকেলে করে মাদ্রাসায় আসা যাওয়া করবে।
কথা গুলো আমি শুনছিলাম পড়ে কাছে গিয়ে বললাম ঠিক আছে। আমিও আনন্দে আত্মহারা। পরের দিন স্কুলে এসে মহা দাম্ভিকতার সাথে বন্ধুদের সাথে বলছিলাম। আমি এই স্কুল ছেড়ে কাহালুতে যাচ্ছি। এখন থেকে আমি কাহালু মাদ্রাসায় পড়বো। বড় ভাই যেখানে পড়ে। অনেকটা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলাম আর মাত্র কয়েক দিন এর আমি কাহালুতে বড় মাদ্রাসায় পড়বো। জানি না সে শুনতে পেরেছিল কিনা জানে কিনা আমি জানতাম না। আমি ভাবছিলাম আমার যাবার কথা শুনে হয়তো কৌতুহল বসতো হলেও সে এসে জানতে চাইবে কৈ যাবি কোথায় পড়বি কেন যাবি এগুলো জিজ্ঞেস করবে। দুঃখের বিষয় সে পাত্তাই দিল না। নিরাশ হয়েই এ বিষয়ে আর কারও সাথে কথা বললাম না।
যদি স্যার ম্যাডাম জানতে পারে তাহলে কেমন হবে। চুপচাপ রয়ে গেলাম। এমনি করে
তৃতীয় শ্রেণীতে পুরোটা সময় চলে যায়। যখন আমি চতুর্থ শ্রেণীতে উঠবো এখনও রেজাল্ট হয়নি। ঠিক তখনই একদিন সকালে হঠাৎই বাবা বলল বাবু আজ মামুনকে মাদ্রাসায় নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিও, আমি কথা বলেছি। আমি কারু সাথে কথা বলতে পারলাম না। বিদায়ও বলতে পারলাম না। সকালে মহা আনন্দে আমি রেডি হয়ে বড় ভাইয়ের সাথে গেলাম। নতুন জায়গা নতুন বিদ্যালয় নতুন বন্ধু বান্ধব সব নতুন আনন্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রথম প্রথম খুব ভাল কাটছিল সময়ও যাচ্ছিল বেশ ভাল। কিন্ত বিধি বাম যে বিষয়টাতে আমি বেশি দুর্বল ছিলাম সেই বিষয়টাই ওখানে প্রতিটি সাবজেক্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
একটি কথা বলে রাখি আমার বাবা ছিলেন একজন কোরআনের হাফেজ আমার বড় ভাইও মাদ্রাসা লাইনে পড়াশোনা করেছে, একজন তুখোর ছাত্র ছিলেন। আমার ছোট বোনটিও মাদ্রাসায় পড়ার কারণে আরবিতে খুব ভালো। পরবর্তীতে ক্লাস নাইনের সম্ভবত জেনারেল লাইনে চলে আসে। তারপর থেকে জেনারেল থেকে পড়াশুনা শেষ করে।
তার ছোটটাও আরবিতে খুব ভালো না হলেও তার জীবনকে গরম তো আরবি সে জানে।
আমার মা ও কোরআন তেলাওয়াত করতে পারেন এবং তিনিও প্রতিদিন তাহাজ্জত এবং তারপরে কোরআন তেলাওয়াত করেন। এটি তার প্রতিদিনের রুটিন।
মুল বিষয়টা হল তখন আমি আরবি পড়তে জানতাম না। আর মাদ্রাসায় যখন আমি ভর্তি হয়েছি, সবে আরবি শিক্ষা আমার শুরু হয় কিন্তু মাদ্রাসাতে মূলত বেশিরভাগ সাবজেক্ট আরবিতেই পড়ানো হয় এই কারণে আরবিতে আমার প্রাথমিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক বড় আকারের ধাক্কা খেয়ে বসি। সাধারণত আলিয়া মাদ্রাসা লাইনে পড়তে হলে ক্লাস ওয়ান থেকে পড়া শুরু করা ভালো অথবা আরবিতে প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হয়। আমি যেহেতু চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি আর আমার আরবিতে প্রাথমিক জ্ঞান নেই এই কারণেই মূলত আমাকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমার মনে আছে আরবি কি যেন একটি সাবজেক্ট নামটা ভুলে গেছি যেখানে আরবিতে প্রশ্ন থাকে এবং পরীক্ষার খাতাতে আরবিতে উত্তর লিখতে হয় যেটা আমার পক্ষে একদমই অসম্ভব ছিল। তবুও মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম পরীক্ষা দিতে মনে করেছিলাম খাতায় যা ইচ্ছে নিজের মতো করে যতটুকু পারি লিখব কি হবে পরে দেখা যাবে। সাধারণত এই সাবজেক্টে চতুর্থ শ্রেণীতে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই পরীক্ষার আগেই আমি জানতে পারি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে।
আর এই সাবজেক্টটা পাইতেন আমার বাবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমাদের ফ্যামিলির সাথে খুব ভালো সম্পর্ক আমাদের শ্রদ্ধেয় মিজান হুজুর। যেহেতু তিনি এই সাবজেক্টটি পান তাই মৌখিক পরীক্ষার্থীও তিনি নেবেন। সব ক্যালকুলেশন করে আমি আর পরীক্ষার হলে যাইনি।
পরীক্ষার হলে আমাকে অনুপস্থিত দেখে মিজান হুজুর আমার বড় ভাইকে জানায়। আজকে মামুন কেন পরীক্ষা দিতে আসেনি। আমার ভাই তখন যেন আকাশ থেকে পড়ে। কারণ আমরা দুই ভাই একসাথে মাদ্রাসায় যাতায়াত করতাম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও একসাথে পরীক্ষা দিতে গিয়েছি।
বড় ভাই তো আর জানতো না মৌখিক পরীক্ষার ভয়ে আমি মাদ্রাসার গাছ বেয়ে ছাদের উপরে গিয়ে বসে আছি।
বড় ভাই অনেক খোঁজাখুঁজির পর কার থেকে যেন শুনতে পারে যে সে দেখেছে আমাকে গাছ বেয়ে উঠে ছাঁদে বসে থাকতে। তখন বড় ভাই গাছের কাছে এসে জোরে করে ডাক দিলে আমি চোরের মত ছাদের উপর থেকে উঁকি দিয়ে জবাব দেয়। আমাকে ছাদ থেকে নেমে আসতে বলে। আমি গাছ পেয়ে ছাদ থেকে নেমে তার পিছনে পিছনে বাড়ি ফিরি। তখন কিছু কিছু কথা হয়েছিল তবে সম্পূর্ণ আমার মনে নেই। পরের দিন যখন আমার বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখলাম, দেখি সমস্ত প্রশ্ন আমার পড়া ছিল আমার জানা ছিল।
তখন নিজের প্রতি অনেকটা রাগাতে লাগলো এত সুন্দর প্রশ্ন ছিল এত জানাশোনা প্রশ্ন ছিল আর আমি পরীক্ষা দিতে যাইনি।
আসলে বিষয়টা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। মৌখিক পরীক্ষা তে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না আর যেহেতু বাবার নিষ্ঠুর বন্ধু অনেকটাই রাগী শিক্ষক ছিলেন তারপরও আমাকে চিনতেন সেজন্য আমি অনেকটা ভীত হয়ে যায়নি।
এমনি করে আমার মাদ্রাসার জীবন চলতে থাকে এর ভেতরে আমার বন্ধু-বান্ধব হয়ে যায় পরিচিত একটা সার্কেলের তৈরি হয়।
তবে একটা বিষয় হচ্ছে মাদ্রাসায় যে আমার বন্ধু সার্কেল ছিল সবাই শহরে বসবাস করত মুস্টিমেই দুই একজন গ্রাম থেকে আসতো। আমিই ছিলাম একমাত্র ছেলে যে কিনা জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত একদম গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা, নিরেট সাদাসিদে একজন ছেলে।
আমার মনে আছে প্রথম দিন যখন আমি আমার মাদ্রাসায় যাই, আমার বড় ভাই আমাকে ক্লাসে বসিয়ে দেয়। যেহেতু আমার বড় ভাই তার ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিল এবং ভিত্তিক প্রাপ্ত ছাত্র ছিল। শুধু তাই নয় মাদ্রাসার ভেতরে ভালো নাম ডাকছিল তার সবাই এক নামে চিনতো তাকে। আমার ক্লাসের ছোট ছোট আমার বয়সী সব ছাত্রছাত্রী ও তাকে খুব ভালো করে চিনতো। বড় ভাইয়ের বদৌলতে প্রথম দিনেই আমার বন্ধু সার্কেল তৈরি হতে শুরু করে। আমি যখন ওদের সাথে কথা বলতে গেলাম সবাই অন্যরকম একটা ধাঁচে শহরের কায়দায় কথা বলতো। আমি ওকে কম তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অনেকটা স্টাইল মারতে শুরু করি। কিন্তু টাইল মারাটার পরিমাণ এতই বেশি হয়ে যায় যে পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারি আসলে এটি আমার সাথে যায় না। আমার পারিপার্শ্বিকতা আমাকে যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবেই চলা উচিত ছিল। দুই এক দিন পরে যখন আমার ভিতর থেকে গ্রামের নিরেট বালকের স্বভাবগত চিত্র বেরোতে শুরু করে, তখন সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। হয়তো ভাবতো যে ছেলেটা প্রথম দিনে সে কিভাবে চলাফেরা করল সেই ছেলেটা দুইদিন পরে এমন কেন হলো। হয়তোবা বন্ধুত্বের কারণে মুখের উপরে কেউ বলেনি। কিন্তু আমি তো বুঝতে পেরেছি, যে আমি তাদের কাছে ধরা খেয়ে গেছি।
অনেকটা লেজ কাটা শিয়ালের মতো।
এখন যখন মনে হয় এসব কথা মনে মনে একা একা হাসতে থাকি।
যাইহোক পরে একদিন মিজান হুজুর আমাকে ডাক দেন সাথে বড় ভাইয়া ছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন তুমি পরীক্ষা দাও নি কেন? যেহেতু তখন আমার মাদ্রাসায় বেশ কয়েকটি মাস পার হয়ে গেছে, তাই কোন আর ভয় ভীতি না করে যা সত্য সেটাই বলেছিলাম। তখন তিনি বললেন তোমার ভাই তো বলল যে সম্পূর্ণ প্রশ্ন নাকি তোমার জানা তুমি নাকি পড়ে দেখেছো সবগুলো নাকি তোমার পড়া ছিল তাহলে কেন পরীক্ষা দিতে আসো নি। তখন আমার অবগতি স্বীকারোক্তি ছিল আমি কখনো মৌখিক পরীক্ষা দেইনি বা এমন কোন অভিজ্ঞতা আমার নেই তাই ভেতরে অনেকটা ভয় কাজ করছিল। আর এ কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
কথা বলার ফাঁকি বড় ভাইকে তিনি পাঠিয়ে দেন ক্লাসে তখন আমি আর হুজুর থাকি পাশাপাশি হয়তোবা হুজুর আমাকে বোঝানোর জন্য কাছে রেখেছিলেন। হুজুর আমাকে অনেক প্রশ্ন বলছিলেন সবগুলো কথারই উত্তর ছিল হ্যাঁ বা না। উত্তরের ক্ষেত্রে যখন আমি না বলতাম এটা ঠিক ছিল কিন্তু হ্যাঁ এর জায়গায় আমি বারবার "হ" বলছিলাম। হুজুর তখন বেশ কিছু ক্ষণ লক্ষ্য করার পর একটা সময় আমাকে জোরে ধমক দেয়। আমি ভয়ে চমকিয়ে লাফিয়ে উঠি এবং হতবিম্ব হয়ে যায়। আমার ভুলের কোন কারণ খুঁজে পাই না। আমি কি অপরাধ করলাম তারও কোন নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং বললেন তুমি কি মাঠে গরু চরাচ্ছ বারবার বলছো "হ" "হ" বলতে হয় জ্বি।
আমি কি করে জানব যে কোন প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলার ক্ষেত্রে জ্বি বলতে হয়।
প্রথম কথা হচ্ছে আমি এমন একটি পরিবারের সন্তান যেখানে এত বেশি শুক্রভাবে খেয়াল করার সময় বাবা-মার কারু ছিল না আমরা বেড়ে উঠছি পড়াশোনা করছি এতে অনেক বেশি পাওয়া ছিল।
এমন কি এমন মফস্বল গ্রামের প্রাইমারিতে পড়াশোনা করতাম প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে হয়নি। এত উচ্চ শিক্ষিত স্যার ম্যাডাম থাকা সত্ত্বেও তারা কখনো এ ধরনের ভুল ধরে দেয়নি। এবং আমার মফস্বল গ্রামের প্রাইমারিতে পড়ালেখা কালীন সময়ে কখনোই কোন ছাত্রকে জ্বি কথাটি উচ্চারণ করতে শুনেনি। তাহলে আমি মামুন সেই পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা একজন খাঁটি বালক কিভাবে এটা আবিষ্কার করব।
যদি এটি আমি সেই মুহূর্তে আবিষ্কার করতে পারতাম তাহলে মনে হয় মহাকাশ বিজয় করার মতো কিছু একটা করে ফেলতাম। যাইহোক সেদিন সেই হুজুরের বদলেতে বুঝতে পারি। আমার ভেতরের আমি কে সব জায়গায় প্রকাশ করতে হলে অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হবে। তখন থেকেই আমি শুরু করি মানুষের দিকে লক্ষ্য করা কে কিভাবে কথা বলছে কোন ভঙ্গিতে কথা বলছে কোন ভাষাটা ব্যবহার করছে। আমিও নিজে নিজে চেষ্টা করতাম প্রথম দেখে আমাকে লজ্জা লাগলেও একটা সময় আমার কাছে এটি সচরাচর হয়ে যায় তখন আমি মোটামুটি সাধু ভাষায় কথা বলতে শিখে গেছি।
দিন যায় আমার মাদ্রাসা জীবন আমার কাছে আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠতে শুরু করে। প্রথম দিকে আরবি বইগুলোর সহজ রূপ থাকলেও যত দিন যায় পড়াগুলো যখন বইগুলোর মাঝের দিকে যেতে শুরু করে তখন আমার কাছে সত্যিই অন্য জগতের ভেতরে বসবাস করছি বলে মনে হতো। আমি কিছুই বুঝতাম না।
এই কথাগুলো আমি কারো সাথে শেয়ার করতে পারতামনা। আমার অনেক বন্ধু ছিল তার ভিতরে একজন ছিল আমার খুব কাছের। কারণ হচ্ছে সে ছিল আমার বাবার আরবি ছাত্র। আমার বাবা যেখানে চাকরি করতেন তার পাশেই ছিল তার বাসা। ছোটবেলা থেকেই সে আমার বাবার কাছে আরবী শিখতো। শুনেছিলাম তাদের পরিবারের সাথে আমার বাবার ভালো একটা সম্পর্ক ছিল। আর এই বদৌলতে সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু তে পরিণত হয়।
তার বাবা ছিল পুলিশ। তাকে তার বাবা মাঝে মাঝেই হাত খরচের টাকা দিত। আর সেই টাকা দিয়ে সে, যা কিছু খাইতো আমাকে শেয়ার করত। যা কিছু কিনতো আমার জন্যেও কিনতো। আমার হাতে হাত খরচ আসতো না। বাবা যদি কোন কিছু খাবার জন্য টাকা দিতেন। তা থাকতো বড় ভাইয়ের হাতে বড় ভাই যখন কিছু খাইতো আমাকেও খাওয়াইতো। সে পরিমাণটা ছিল খুব কম। স্বাচ্ছন্দ পরিবারের সন্তান তাই সব সময় বাসা থেকে টাকা পাবার আশা করাটাও কঠিন।
মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হচ্ছে এটাই বিশাল কথা।
মন থেকে ইচ্ছা থাকলেও আমি কখনোই তাকে তার মত করে খাওয়াতে পারিনি। তবে সে কখনোই কোনদিনও বলেনি তোর কাছে কেন টাকা থাকে ন?। তোর কি কোন কিছু খাইতে ইচ্ছা করে না। তোর কি কোন কিছু কিনতে ইচ্ছা করে না?
বরং আমার মনে আছে একদিন সে আমাকে দেখে বলল মামুন চল একটু বাজারে যাব। আমি বললাম কেন? সে বলল কিছু জিনিস কিনব। আমি বললাম কি জিনিস। সে বলল চল না।
ওকে চল।
বাজারে গিয়ে বললা আমি ঘুড়ি তৈরি করবো এইজন্য কিছু কাগজ ও সূতো কিনবো। এইবলে দোকানে গেলাম দুইজন। সে দোকানদারের কাছ থেকে সুতা ও কাগজ চাই। একটা ঘুড়ি বানানো এবং উড়ানোর জন্য যা যা প্রয়োজন এখানে সামনে দিল।
তখন হাসান বলল দুইটা ঘুড়ির জন্য দেন। দোকানদারও তাই দিল। সূতা দিয়েছিল জাল বুননের নাইলন সূতো। হাসান হাতে নিয়ে আমাকে বলল এটা ঠিক আছে মামুন? আমি দেখলাম চিকন, মাথা মোটা আমি, বললাম যদি ছিঁড়ে যায়। আর একটু মোটা হলে ভাল হতো। তাই বলে সূতি যাকে বলে লেপের সূতো ঐটা বেড় করতে বললাম। দোকানদার তাই দিল। কিনা হয়ে গেলে এক সেট সে আমাকে দিয়ে বলল এটা তোর।
আমার কাছে তখন স্বপ্ন মনে হলো। কারন এতো টাকা দিয়ে সূতো কিনে ঘুড়ি উড়ানো আমার জন্য ছিল বিলাসিতা। তবে সে যেহেতু দিয়েছে তাই আমার শৈশবের এমন ঘুড়ি উড়ানোর স্মৃতি ছিল।
কষ্টের বিষয় হল প্রথম যে সূতো দিয়েছিল ঘুড়ি উড়ানোর জন্য পারফেক্ট সূতো। আমি বুদ্ধিজীবী মোটা সূতো কিনে ঘুড়ি উড়তে গিয়ে দেখি সুতোর ভারে ঘুড়ি বেশি দুর যেতে পারেনা। তবে উরিয়েছি। খেলা দিয়ে কথা। আমার বন্ধু হাসানেরও একই অবস্থা ছিল। কি আর করার। বন্ধু বলে কথা। সেও আমার মত করেই ঘুড়ি উড়িয়েছে।
আমার বন্ধুর নাম ছিল হাসান। হাসান আমাকে প্রায় প্রতিদিন খাওয়াতো। এমনকি বাজারে গেলেও আমাকে নিয়ে যায় তো। নিজের জন্য কিছু কিনলে আমাকেও কিনে দিত। আমি তাকে কিছু দেবার মত সক্ষমতা ছিল না।
যেহেতু সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল তাই তার কাছে আমার বিষয়টা খুব ভালোভাবে শেয়ার করলাম। তাকে বললাম দোস্ত আমাদের ক্লাসে আরবি যে সাবজেক্ট গুলো পড়ানো হয় তুই সবগুলো পড়তে পারিস তুই পড়া দিতে পারিস। কিন্তু আমি এগুলোর কিছুই বুঝিনা। বাসা থেকে অভিধান দেখে যা মুখস্থ করে আসি, ক্লাসে আসার পর তা ভুলে যাই। আমি কি করবো।
সে আমাকে পরামর্শ দেয়, অভিধান দেখে উচ্চারণ মুখস্ত করে শ্রেণী কক্ষে আসলে তা ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক এবং এভাবে পড়াশোনা করলে আমি বেশিদিন স্মরণে রাখতে পারব না। তুমি ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে আরবি শিখতে থাকো যখন তুমি আরবি পড়তে পারবে অর্থগুলো বুঝতে পারবে তখন তোমার কাছে সবকিছুই সহজ মনে হবে।
তারে পরামর্শ যথাযথ ছিল কিন্তু আমার জন্য খুব কষ্টসাধ্য। এভাবেই চলতে থাকে মাদ্রাসার জীবনের আরো কয়েকটি দিন।
প্রতিদিনের মতো আমি ও বড় ভাই সাইকেলে করে মাদ্রাসায় যাইতাম। ছুটি শেষে দুই ভাই আবার একসাথে বাড়ি ফিরে আসতাম। কোনভাবেই আমার পড়ার প্রতি মন বসছিল না। মাদ্রাসায় আসা-যাওয়াটা যেন আমার কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বড় ভাই সাইকেল চালাত আর আমি পিছনে ক্যারিয়ারে বসে থাকতাম। আমাদের মাদ্রাসায় যাবার সময় বাজারের সামনে দিয়ে যাইতে হতো। বাজারে সামনে ভ্যান রিক্সার স্ট্যান্ড ছিল সেখানে অনবরত ছোটখাটো ভিড় থাকতো। হঠাৎ একদিন বড় ভাই ভিড়ের মাঝখান দিয়ে যাবার সময় সাইকেল থেকে কোন কারনে কাপিয়ে তোলে। আমিও অমনোযোগী ছিলাম। আমার একটা পা সাইকেলের চাকার ভেতরে চলে যায়। চাকা জ্যাম হতেই দুই ভাই সাইকেলসহ রাস্তায় পড়ে যায়। পাশ থেকে অনেক মানুষজন দৌড়ে আসে, আমার পা কেউ বের করতে পারছিল না। দুই তিন জন মিলে অনেক চেষ্টা করে আমার পা বের করে। সাইকেলের চাকা নষ্ট হয়ে যায়। আমার পা চামড়া ছিঁলে রক্ত বের হতে থাকে। এরপরে কি হয়েছিল আমার সঠিক মনে নেই।
বাসায় ফেরার পর এই ঘটনা বাবা-মা শুনতে পারে। তারা চিন্তা গ্রস্ত হয় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। কারন আমরা দুজনেই ছোট ছিলাম বড় ভাই আমার চেয়ে খুব একটা বড় ছিল না। এমনি করে কিছুদিন যাওয়ার পর একদিন অর্ধেক বেলায় আমি সরাসরি মাদ্রাসা থেকে বই ব্যাগ নিয়ে বাবার মসজিদে চলে আসি। বাবার মসজিদটাও বাজারে সামনে ছিল স্টেশনের কাছে। মাদ্রাসা থেকে হেঁটে আসলে খুব বেশি হলে সাত থেকে আট মিনিট সময় লাগবে। স্টেশনে আসার পরপরই দেখতে পারি বাবা চা স্টলে বসে চা খাচ্ছেন। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াই। বাবা বললেন কিছু খাবে, দুপুরে টিফিন খেয়েছো। আমি কোন কথার উত্তর না দিয়ে কান্না করতে থাকি।
বাবা তখন বলে আচ্ছা ঠিক আছে কি হয়েছে শুনবো। কিছু খাবে। আমি বললাম না।
বাবা তখন চা খাওয়া শেষ করে আমাকে নিয়ে তার বিশ্রামের ঘরে গেলেন।
বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে বল। তখন ছিল গরমকাল আমি বাবাকে বললাম তোমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রচন্ড গরমের ভাব এবং মাথা ঘোরানোর মতো। যা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা কথা ছিল। আমি তখন কাবলিওয়ালা সেট পড়তাম পায়ে জুতো থাকতো তাই আমার কাছে মনে হয়েছিল এই কথা বললে হয়তো বা বেঁচে যাব। কিন্তু কি আর করার সেদিনের মত বেঁচে গেলেও পরদিন থেকে বাবা বললেন আজ থেকে জুতা পরার দরকার নেই চটি স্লিপার পড়ে মাদ্রাসায় যাবে আমি মাদ্রাসার সুপারিনটেন কে বলে দিব। তিনি কিছু বলবেনা। এমনি করে আরো কয়েকদিন চলতে থাকে। আরবি সাবজেক্ট এর কারনে মাঝে মাঝেই শ্রেণীকক্ষে মার খাইতাম। নিজেকে লজ্জা লাগতো।
তখন একা একা ভাবতাম যে ছেলেটা মফস্বল গ্রামের প্রাইমারিতে টপদের মাঝে ছিল। কোনদিন করার জন্য ক্লাসে মার খেতে হয় নাই। সেই ছেলে এখন আর হামেশাই মাঝে মাঝেই আরবি সাবজেক্ট থাকলেই মার খেতে হতো।
কোন উপরন্তর না পেয়ে একদিন বাবাকে সরাসরি বললাম। আমার নানাবিধ সমস্যার কথা। মাদ্রাসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথায় কি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, কেন মাদ্রাসায় পড়তে ভালো লাগে না সব খুলে বললাম।
বাবা আমার কথা শুনে রাজি হলে বললেন ঠিক আছে যদি তুমি পড়তে না চাও প্রাইমারিতে ভর্তি করে দেই তুমি সেখানেই পড়াশোনা কর।
আমার গ্রামের প্রাইমারিতে ভর্তি হওয়াটাও আমার সম্মতি ছিল না। কেননা যখন আমি এখান থেকে চলে যায় অনেক বড় বড় কথা দাম্ভিকতার সাথে বলেছিলাম। আর সেই আমি কিনা ফিরে এসে আবার সেখানেই পড়াশোনা করব। তাও আবার যে বন্ধুদের সাথে বড় গলাবাজি করেছি তাদের সাথেই। আমি বাবাকে অসম্মতি জানালাম। বললাম আমি এখানেও পড়বো না আমাকে কাল সদরে মডেল প্রাইমারিতে ভর্তি করে দিন।
বাবা রাজি হলেন না। কেননা এ ক্ষেত্রে খরচ আরো বেড়ে যাবে। প্রতিদিন আমার স্কুলে যাতায়াত খরচ, বড় ভাইয়ের স্কুলে যাতায়াত খরচ আরো আনুষাঙ্গিক অনেক খরচ মিলিয়ে বাবার পক্ষে তা প্রায় অসম্ভব ছিল।
বাবা বললেন না তোমাকে গ্রামের স্কুলেই পড়তে হবে। আমি রাজি হলাম। বাবা হুটহাট করেই বললেন আমি প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলেছি কাল থেকে তুমি স্কুলে যাবে। তখন আমার কোন সাধারণ শার্ট-প্যান্ট ছিল না। যেহেতু আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার জন্য ভর্তি হয়েছিলাম আমার সব কাপড়-চোপড় ছিল কাবলিওয়ালা বা পাঞ্জাবি টাইপের পোশাক। যা সচরাচর প্রাইমারি স্কুলেতে কেউ পড়ে যায় না। আমি বললাম আমার তো শার্ট প্যান্ট নেই। বাবা বললেন যা আছে তাই পড়ে যাবে। আমি পড়লাম মহাবিপাকে, প্রথমত যাদের সাথে গলাবাজি করেছি বড় বড় কথা বলে স্কুল ছেড়েছি তাদের কাছে গিয়েই আমাকে পাশে বসে ক্লাস করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ সেই মাদ্রাসার পোশাকেই ক্লাস করতে হবে। কোন উপায় না পেয়ে কাবলিওয়ালা মাদ্রাসার পোশাক পরেই প্রথম দিন স্কুলে গেলাম। তখন সম্ভবত চতুর্থ শ্রেণীর প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়ে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা আসন্ন প্রায়। এইজন্য বেশি তোর জোর ছিল বাড়ি থেকে। প্রথম দিন শ্রেণীকক্ষে যাবার পরপরই সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, এখন কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল তারা বোধহয় আমাকে ভিনগ্রহের কোন প্রাণী ভাবছে। প্রথম দিন কোন ভাবে কেটে গেলেও দ্বিতীয় দিন হয়ে উঠল আরো অসহনীয়। কিছুই ভালো লাগছিল না। সম্ভবত তৃতীয় নাম্বার ক্লাসে সমাজবিজ্ঞান পড়ানোর সময় আমাদের একজন হিন্দু শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের নাম ছিল কি যেন মজুমদার। তবে আমরা সবাই ডাকতাম পন্টু স্যার বলেই। তিনি এসেই সমাজ বই বের করে পড়ানো শুরু করলেন। সমাজ বইয়ের একটা অংশে বিভিন্ন পোশাকের কালচারাল বর্ণনা ছিল মনে হয়। সেখান থেকে পড়াতে গিয়ে তিনি উদাহরণ দিতে গিয়ে আমাকে সামনে ডেকে নেন। আমার কাবলিওয়ালা পোশাকে দেখিয়ে বলেন এটি একটি ঐতিহ্য পোষাক এবং স্যার পড়েছিল পাঞ্জাবি নিজের পাঞ্জাবি হাতে ধরে দেখিয়ে বললেন এগুলো হচ্ছে পুরনো ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
তখন সবার চোখ আবার আমার দেখে পড়ল তবে তা সেই প্রথম দিনের মতো তাকানো না। এবার আমার দিকে সবাই তাকালো একটু কৌতুহলী এবং জানার আগ্রহ থেকে। তখন আমার মনের ভেতরে যে দ্বিধা সংকোচ কাজ করতো তা কেটে গেল সেদিন থেকেই......
Next part coming soon
Click here 👇
0 Comments