"জীবন ডাইরীর এক অসমাপ্ত গল্প"
পার্টঃ ০১
জীবনের শুরুটা যদি ভূমিষ্ঠ্যের সময় টাকে বলে থাকি তবে আমি সার্থক। আমি শুনেছি ১০০% সবল শিশু না হলেও সুস্থতার সাথেই আমার জন্ম হয়, আমার মা সাক্ষী দিয়েছেন।
মায়ের বুকের দুধ নাকি আমার একমাত্র সম্বল ছিল। তাও নাকি আমার অনিহা। মা অনেকটা জোর করেই মাঝে মাঝে দুধ খাওয়াতেন। যখন বুঝতে পারলেন মায়ের বুকের দুধে তেমন আগ্রহ নেই। তখন বাবা মায়ের মনে হয় অনুমান হল, হয়তো তাদের সন্তানের ভিন্ন কিছু বা আলাদা স্বাধের খাবার প্রয়োজন।
আমার পরিবার অনেক সংগ্রামী ছিল, তাই হয়তো হিসাবের খাতা লম্বা ছিল।
আমি ছিলাম পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। কেন বললাম? তার কারন হয়তো অনেকেই বুঝতে পেরেছেন। আবার অনেকেই না বুঝলেও বুঝতে পারবেন। যে কোন পরিবারের প্রথম সন্তান থাকে রাজপুত্র। পরিবারের শত কষ্ট অভাবের পরেও সন্তানের জন্য আলাদা কেয়ার থাকে। যা, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরের সন্তানদের বেলা সম্ভব হয়ে উঠে না, এটাই বাস্তবতা।
যাইহোক যেহেতু মায়ের দুধ খাওয়ার প্রতি আমার অনীহ তাই বাবা মা আমার জন্য আটা ঘাটির ব্যবস্থা করেন। যতটুকু মায়ের কাছে জানতে পারি, প্রথম দিকে একটু খেলেও পরে সে ব্যবস্থাও অচল হয়ে পরে।
তখন বাবা মা বুঝতে পারেন আমার আসলে খাওয়ার প্রতিই একটু অনীহা ছিল। আর একারণেই আমি তেমন একটা সবল শিশু হয়ে উঠতে পারিনি। মা বলতো আমি মায়ের কোলেও বেশি সময় কাটাতাম না। সারাক্ষণ মাটিতেই শুয়ে বসে থাকতাম আর এক মনে খেলা করতাম। এভাবেই বেড়ে উঠা আমার। আমার ভাগ্য আর একটু ভালো, আমি আমার ছোট বয়সে আমার বোনকে পেয়েছি। আমার যখন দু বছর বয়স তখন আমাদের পরিবারে নতুন অতিথি যুক্ত হয়, আমার আদরের ছোট বোন।
আমাদের পরিবার মা একা হাতে সামাল দিতেন।একক একটি বাড়িতে থাকতাম আমরা, তাই মাকে সহযোগিতা করার মত কেউ ছিল না। যেটা সাধারণত যৌথ পরিবারে হয়ে থাকে। আমি জেনেছি পরিবারের সকল কাজ রান্না, বাড়ি পরিষ্কার, বিশেষ করে গরুর কাজে অনেক ব্যস্ত থাকতেন। এর সাথে আমার ছোট বোনের দেখাশুনা খেয়াল রাখা সব মিলিয়ে একটি রোবট ওমেন হিসেবেই পরিচিত আমার কাছে আমার মা।
এমতো অবস্থায় আমার প্রতি সঠিক ভাবে নজর করা প্রায় অসম্ভব। তবে আমার বড় ভাই আমাকে সময় দিতেন। তবে সে আমার চেয়ে দু বছরের বড় ছিল, তার মানে সেও ছোট। তাই আমাকে সময় দেয়া ব্যতীত আলাদা যত্ন নেওয়া তার পক্ষেও অসম্ভব।
তারপরেও আলহামদুলিল্লাহ আমার শিশুকাল আমি মনে করি অনেক ভালো ছিল।
শারীরিক ভাবে দুর্বল থাকলেও আমি নাকি একটু আলাদা বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলাম। তা জানতে পারি পরিবারের সদস্যদের মুখেই।
আমি যখন থেকে খেলাধুলার জন্য বাড়ির বাহির হয়েছি, তখন থেকেই বাড়ির বাহিরে কৌতূহলী কোন জিনিস পরে থাকতে দেখলে কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতাম এবং সেই নষ্ট খেলনা পার্ট বাই পার্ট খুলে ফেলতাম, তা নিজের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে খেলতাম।
আর একটি কথা না বললেই না। আমার সময়টাই সমাজের কিছু ব্যাক্তি ছাড়া অধিকাংশ মানুষ ছিল অভাবী বা দরিদ্র। কর্ম সংখ্যা ছিল সীমিত, কর্মক্ষম মানুষ থাকলেও ছিল নিরুপায়।
তবে সে সময়টাই আলহামদুলিল্লাহ আমরা দরিদ্র পরিবারের হলেও বাবার সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের পরিবার ছিল স্বাচ্ছন্দ ও গোছানো। হয়তোবা এটি ছিল বরকতময় পরিবার। কারন, আমার বাবা ছিলেন মসজিদের ঈমাম। বেতন ছিল খুব সামন্য। আমি বেতনের কথা এখানে কেন বলছি? তার কারন প্রেক্ষাপট বুঝাতে হবে তাই। এছাড়া বাবার চাকরী বা বেতনে কোন কথা নেই।
আমার বাবা তখন কাহালু সদরে স্টেশন মসজিদে ২০০০ টাকার বেতনে চাকরি করতেন। তিনি একজন কুরআনের হাফেজ ছিলেন। তখন মোটামুটি আমরা তিন ভাইবোন সহ পাঁচ জন সদস্যের পরিবার ছিল। আর সেই চাকরির সীমিত বেতন দিয়েই চলতো আমাদের পরিবার, তবুও কোন দিন বুঝতে পারিনি, আমাদের পরিবার দরিদ্র। বাবা কখনোই বুঝতে দেয়নি। তাই আমি সব সময়ই বলি আমাদের স্বাচ্ছন্দ পরিবার, স্বচ্ছল বলিনি কখনোই। কারন অভাব দেখতে না পেলেও মাঝে মাঝে বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় বুঝতাম। আমরা স্বচ্ছল পরিবার নই। আমরা সাচ্ছন্দ পরিবার।
যেখানে আমরা সবাই পারস্পরিক ভালোবাসা শেয়ার করতাম এবং অল্পতে খুশি থাকতাম।
ছোট বেলা থেকেই আমাদের পরিবার তাই শিখিয়েছেন। আজও তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষা করতে ভয় পাই। কারন এটি আমাদের সাথে যায় না।
সব শিক্ষা পাঠ্যপুস্তক বা ইটপাথরের ঘরে পাওয়া যায় না। মৌলিক শিক্ষা থাকে বাবা মা, পরিবার, প্রতিবেশী সমাজ প্রকৃতির মাঝে। অনেক ক্ষেত্রেই এই শিক্ষা_ আপনাকে সহজ করে গ্রহণ করে নিবে। আবার কিছু বিষয় আপনাকে নির্যাস বের করে নিতে হবে।
আমি জানি না কতটুকু আমাকে গ্রহণ করেছে, আমি কতটুকু নিতে পেরেছি। তবে এটি সত্য বাস্তব জীবনে এসে বাবার শিক্ষা অনেক অনেক বেশি উপলব্ধি করতে পারছি, কারন বাবার মত আমিও বাবা - আমিও পুরুষ। তবে মেয়ে হলে হয়তো মায়ের শিক্ষা বেশি উপলব্ধি করতে পারতাম। তাই বলে মায়ের শিক্ষা কাজে লাগছে না, ঠিক তা নয়।
একজন মানুষের বাস্তব জীবনে সকল ক্ষেত্রের শিক্ষা প্রতিফলন ঘটে।
বাবার শিক্ষা বলতে বাবার শাসন বারন উপদেশ সবকিছুই যেন অগ্রিম বর্ণিত কিতাব। আমার বাবা সহজ সরল ও নরম মনের অধিকারী। বাবার ভালবাসা আমাদের জন্য ছিল অপ্রকাশিত স্নেহ মাখা। তিনি অন্য বাবাদের মত অতটা নিবিড় ছিলেন না। কারন এ বৈঠাহীন পরিবারের একমাত্র পাল ছিলেন তিনি। তাই হয়তো ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব হতো না। আমরা এখন চার ভাইবোন। সবাই মা বাবাকে অনেক ভয় করতো। আমি একটু কম।
কারন জেনেছি আমাকে নাকি শাসন খুব কম করতো। শত অপরাধে আমি ছাড় পেতাম, যা আমার বড় কখনোই পায়নি। আমি নাকি বাবার বাবা অর্থাৎ দাদার মত। হয়তো এটাই স্পেশাল কারন হতে পারে। তবুও মাঝে মাঝে ঝড়ের কবলে পড়তাম।
একটা গল্প বলি শুনুন,
ঘটনা মনে থাকলেও সে ভাবে বয়স বা সময় তেমন মনে নেই। আমি ছোট তবে সবকিছুই বুঝতে পারি। বড় ভাই আমার থেকে আনুমানিক দু বছরের বড় হবে। আমি আমার এক বন্ধুর সাথে স্কুল মাঠে, ঠিক মাঠেও না স্কুলের পাশ দিয়ে চলা রাস্তায় দু জন খেলছি। আমার বড় ভাই হঠাৎই আমার কাছে হাজির। হাতে চুম্বকের দুই অর্ধ।
আমাক বলছে চুম্বক নিবি?
আমি যেন না চাইতেই স্বপ্ন হাতের মুঠোই পাচ্ছি। কারন ছোটবেলা চুম্বক দন্ড পাওয়া বা সংগ্রহ করা কষ্ট সাধ্য ছিল। কে দিবে? কোথায় পাবো?
তার পরেও আমার কাছে ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা চুম্বক সংগ্রহে ছিল। বড় চুম্বক অর্ধ দেখে লোভে পড়ে গেলাম।
আমি বললাম "হ-----দে।"
আমার বড় ভাই বললেন, তবে কথা আছে। আমি বললাম কি কথা। তিনি বললেন। এই চুম্বক আমাকে দিয়েছে আমার বন্ধু। আমিও চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলাম। কারন তিনি তখন প্রাইমারীতে পড়তেন বন্ধুবান্ধব ছিল। দিতেই পারে।
আমি বললাম ঠিক আছে দে। তিনি অনেকটাই চোরের মত ফিস ফিস করে বললো। তোর কাছে চুম্বক আছে, বাড়িতে যেন কেউ না জানে। আমি তো মহা খুশি চুম্বক পাওয়া দিয়ে কথা। আমি বললাম, "আচ্ছা ঠিক আছে কাক্কু কমোনা, দে।"
আমার ভাগে আসলো অর্ধেক দন্ড। আর অর্ধেক নিলেন বড় ভাই। যথারীতি আমার খেলাধুলার পর্ব শেষ বাড়ি ফিরেছি।
ভাইও বাড়ি ফিরেছে সম্বত বিকাল বেলা সঠিক সময় মনে নেই। সবাই বাড়িতে। বাবা সাধারণত বিশ্রামের সময় রেডিও শুনতেন। ছোট্ট রেডিও বাবা বারবার অন অফ করছেন, বাজাতে চেষ্টা করছেন, কিন্ত রেডিও বাজছেনা।
বাবা রেডিও ঠিক করার জন্য বা দেখার জন্য রেডিও খুলেছেন। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। কারন রেডিওর ওজন হালকা ছিল। বার বার থাবা দিয়েও চালু হচ্ছে না। তখন খুলে দেখাটায় স্বাভাবিক। খুলে দেখেন রেডিওর কলিজা নেই। বাহিরে এসে দেখেন আমি কলিজার একটুকরো নিয়ে খেলছি, আমি যেহেতু ছোট, আমার পক্ষে এটা করা অসম্ভব। বাবা জিজ্ঞেস করলেন চুম্বক কৈ পেলে? আমি অকপটে শিকার করলাম___ "বাবু ভাই দিছে। অর বন্ধু ওকি একটা দিছে তার থ্যাকে আদ্দেক বাবু ভাই হামাকি দিছে আর আদ্দেক উঁই লিছে।"
আমার কথা বলা শেষ না হতেই বাবার সম্পূর্ণ বুঝা শেষ।
অন্তর্বর্তী হামলার আগে কিছু কথা বলে নেয়, এতে করে আমার কথা পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।
আমাদের তিনটি ঘর সারিবদ্ধ ছিল। একটা ঘরে আমি ও আমার ভাই থাকি। মাঝের ছোট ঘর, রান্না ঘর হিসেবে ব্যবহার হত। বাবা মা বাহিরে বারান্দায় বিছানা করে থাকতেন, কারন আমাদের গোয়ালে গরু ছিল। বাহিরে ধান রাখা থাকতো। বাড়িতে চুরিও হয়েছে এর আগে। তাই সবদিক থেকে নিরাপদ অবস্থান ছিল বারান্দাতে ঘুমানো।
এবং তার পাশে আর একটি ঘরে কিছু বালি সিমেন্ট একথায় ষ্টোর রোম হিসেবে ব্যাবহার হত। দরজা ছিল, জানালা ছিল কিন্ত জানালাতে আড়াআড়ি ভাবে বাঁশ দিয়ে রাখা ছিল যেন জানালা দিয়ে কেউ বাড়ির ভিতর না আসতে পারে।
পিছনের বা বাহিরের জানালা বাঁশ চাটাই দিয়ে সীলগালা করে রাখলেও বাড়ির ভিতরেরটা শুধু বাঁশ দেয়া ছিল।
যাই হক আমার বলা শেষ না হতেই বাবা বড় ভাইয়ের হাত ও আমার হাত ধরে ষ্টোর ঘরে নিয়ে দরজা আটকিয়ে দেয়। এদিকে মা যেহেতু সব শুনতেছিল, আমাদের কে ঘরের ভিতরে নিতেই মা বুঝতে পারে, এটি একটি বড় ধরনের ঝড়ের আভাস। মা দুর থেকে আসতে আসতেই আমাদের ভিতরে নেওয়া শেষ। মা রক্ষা করতে না পেরে উচ্চ স্বরে চিৎকার করে কান্না করে উঠে। প্রতিবেশি মানুষ দিয়ে ক্ষনিকেই আমাদের বাড়ি পূর্ন হয়ে যায়।
আমাদের যখন ভিতরে নিয়ে বাবা ঘরের দরজা ভিতর থেকে আটকিয়ে দিচ্ছেন, আমি যেহেতু ছোট ভয়ে দরজাতে থাবর দিচ্ছি আর কান্না করছি। আর আমার বড় ভাই ওদিকে বাড়ির ভিতর যে জানালা ছিল ঐদিক দিয়ে শরীরের অর্ধেক অর্থাত কমর পর্যন্ত বাহিরে গেছে।
বাবা দ্রুত গিয়ে বড় ভাইয়ের পা ধরে ফেলে। ওদিকে বাহির থেকে মা ও আমাদের প্রতিবেশী ফুফা বড় ভাইয়ের হাত ও ডানা ধরে টানছে।
ঘরের ভিতরে থেকে বাবা টানছে পা ধরে_ ঘরের ভিতর আনার জন্য, ওদিকে ফুফা ও মা টানছে ঘর থেকে বের করার জন্য। একপর্যায়........
(Pls continue next part)
Click Here 👇
0 Comments